গোপালগঞ্জ হচ্ছে একটিঐতিহাসিক ওঐতিহ্যবাহী জনপদ। এখানে রয়েছে নানাবিধদর্শনীয় স্থানও প্রত্নতাত্বিকনির্দেশনাবলী। কালের গর্ভে অনেক নিদর্শনাবলিহারিয়ে গেলেওএখানে বিভিন্নপ্রাচীন ওঐতিহ্যবাহী মসজিদ, মন্দির, গীর্জা, মঠএ জনপদেরগুরুত্বকে প্রাণবন্ত করে রেখেছে। গোপালগঞ্জেরসবচেয়ে বড়োপর্যটন আকর্ষণ জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখমুজিবুর রহমানসমাধি সৌধ, টুঙ্গীপাড়া। এছাড়া আরো কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণনিদর্শনের বিবরণ উপস্থাপন করা হলো:
টুঙ্গীপাড়ার ঐতিহাসিকনিদর্শনঃ
বঙ্গবন্ধু সমাধিসৌধ:
জাতির জনক বঙ্গবন্ধুশেখ মুজিবুররহমানের সমাধিসৌধ গোপালগঞ্জেরটুঙ্গীপাড়ায় অবস্থিত। ১৯৭৫ সালের ১৫আগস্ট কিছুসংখ্যকবিপথগামী সেনাঅফিসারের হাতেসপরিবারে নির্মমভাবেনিহত বঙ্গবন্ধুকেএখানে সমাধিস্থকরা হয়।সমাধি সৌধটিকেবর্তমানে একটিদৃষ্টিনন্দন স্থাপনায় পরিণত করা হয়েছে।
মুকসুদপুরের ঐতিহাসিকনিদর্শনঃ
ঐতিহাসিকনিদর্শনে মুকসুদপুরসমৃদ্ধ। স্থাপত্য শিল্পে আভিজাত্যের স্বাক্ষর বহনকরে আসছেবাটিকামারীর রায় বাড়ী, বনগ্রাম ভুঁইয়াবাড়ী ওনারায়ণপুরের মুন্সী বাড়ীর বহু কক্ষবিশিষ্ট দ্বিতলাইমারত সমূহ।মার্বেল ওমোজাইক পাথরেরব্যবহার ওনির্মাণ শৈলিতেযা আজওকালের সাক্ষী। এখানকারমন্দির সমূহেরবিশেষ কারুকাজআজও বিস্ময়ের বিষয়।গোহালার বাজারসংলগ্ন ভবনসমূহ, মোচনা, উজানীর জমিদারবাড়ি, চাওচারদত্ত বাড়ি, চ্যাটার্জি ও মুখার্জি বাড়ি, মহারাজপুরেরদত্ত বাড়িসহশতাধিক ভবনস্থাপত্যের নিদর্শন। খানপুরা চৌধুরী বাড়িরমসজিদ, বালিয়াকান্দী মসজিদওস্থাপত্যের বিশেষ নিদর্শন বহন করে।
গোপালগঞ্জ সদরেরঐতিহাসিকনিদর্শন:
থানা পাড়া জামে মসজিদ
গোপালগঞ্জ শহরের প্রথমমসজিদ হলোথানাপাড়া মসজিদ।১৯২০ থেকে১৯২১ সালেরমধ্যে মসজিদটিনির্মাণ করাহয়। খেলাফতআন্দোলন, অসহযোগআন্দোলন ওপাকিস্তান আন্দোলনের সময় থানাপাড়া মসজিদছিল এএলাকায় মুসলমানদেরমিলন কেন্দ্র।
খাগাইল গায়েবী মসজিদ
গোপালগঞ্জ সদরউপজেলার হরিদাসপুরইউনিয়নের খাগাইলগ্রামে একটিপুরাতন পাকামসজিদ রয়েছে।মসজিদটির নির্মাণেরসন তারিখজানা যায়না, তবেস্থানীয় লোকজনিএটিকে 'গায়েবীমসজিদ' বলেঅবহিত করেথাকেন। মসজিদটিরনির্মাণ শৈলিদেখে অনুমানকরা যায়এটি আনুমানিক১৫০ বছরপূর্বে নির্মাণকরা হয়েছে।
কোর্ট মসজিদ, গোপালগঞ্জ
কোর্ট মসজিদ
গোপালগঞ্জ জেলার প্রাণকেন্দ্রেঅবস্থিত জেলারকেন্দ্রীয় মসজিদ কোর্ট মসজিদ। ১৯৪৯সালে তৎকালীনপাকিস্তানের গভর্ণর জেনারেল খাজা নাজিমুদ্দিনমসজিদটির শুভউদ্ধোধন করেনএবং পরবর্তীতেস্থানীয় মহকুমাপ্রশাসক কাজীগোলাম আহাদেরবদান্যতায় তা নির্মিত হয়। মসজিদটিতেসুদৃশ্য উচ্চমিনারসহ বৃহদাকারপ্রবেশ গেটএবং একটিসুদৃশ্য বড়গম্বুজ ওদুটি ছোটগম্বুজ রয়েছে।ঐতিহ্যবাহী মসজিদটির নির্মাণ শৈলি দৃষ্টিনন্দন।
সেন্ট মথুরানাথ এজিচার্চ
গোপালগঞ্জ জেলা সদরেথানাপাড়ায় ১৮৭৫ সালে খৃষ্টান ধর্মাবলম্বীদেরজন্য সেন্টমথুরানাথ এজিচার্চ প্রতিষ্ঠিতহয়। এরপ্রতিষ্ঠাতা মথুরা নাথ বোস। জেলাসদরের থানাপাড়ায়প্রাচীন স্থাপত্যেরমধ্যে এটিঅন্যতম।
সর্বজনীন কালিমন্দির
সদর উপজেলাধীন খাটরামৌজায় বর্ণিতমন্দিরটি অবস্থিত।মন্দিরটি ইংরেজি১৯৮১ সালেপ্রতিষ্ঠিত হয়। প্রতি বছর কালিপূজা, দুর্গাপূজা ও নামযজ্ঞের সময় এখানেহাজার হাজারভক্তের সমাগমঘটে। এছাড়াওবর্ণিত পূজাপার্বণ উপলক্ষ্মাসিক, পাক্ষিকও দিনব্যাপী মেলাবসে। কালিপূজামেলায় যাত্রা, সার্কাস, পুতুলনাচ, নাগরদোলাপ্রদর্শিত হয়।
নয়নাভিরাম গোপালগঞ্জ
বিলরুট ক্যানেল
বৃটিশ আমলে ভেড়ারবাজার ছিলএ এলাকারব্যবসা বাণিজ্যেরপ্রাণকেন্দ্র। মধুমতির মানিকদাহ বন্দরের নিকটথেকে উত্তরএবং উত্তরপূর্ব দিকেউরফি, ভেড়ারহাট, উলপুর, বৌলতলী, সাতপাড়, টেকেরহাটহয়ে আড়িয়ালখাঁর শাখানদী উতরাইলবন্দরের কাছাকাছিপর্যন্ত ৬০/৬৫ কিলোমিটারর্দীঘ ক্যানেলখনন করাহয়। ক্যানেলটি৪০০ ফুটপ্রশস্ত, গভীরতা৩০ ফুট।ক্যানেলটি ১৮৯৯-১৯০৫ সালে নির্মিতহয়। এক্যানেলটি খননের ফলে নদী পথেঢাকা-খুলনারদুরত্ব ১৫০মাইল কমেযায় এবংবঙ্গোপসাগর হয়ে আসা পন্য সহজেইকলকাতা বন্দরেপাঠানো সহজহয়। এটিবঙ্গের সুয়েজখালনামে পরিচিত।তৎকালীন সময়েক্যানেলটির নির্মান ব্যয় হয় ৩৩,৬৬,৮৭৯/- টাকা।
আড়পাড়া মুন্সিবাড়ী
ভেড়ারহাটের অপর পাড়েআড়পাড়া গ্রামেপ্রকৌশলী মুন্সিইকরামুজ্জামান সৃজন করেছেন একটি মনোরমউদ্যান। ঘাটবাঁধানো দীঘিরপাড়ে আধুনিকস্থাপত্য শৈলিরদালান কোঠা, পাকা রাস্তা, দীঘির অপরপাশে নয়নাভিরামবৃক্ষরাজি, ক্যাকটাস এবং দেশী-বিদেশীসুন্দর সুন্দরফুলের গাছ।পাশেই শতাব্দীপ্রাচীন মসজিদেরমিনার। বাগানেরপাশ ঘেষেরয়ে চলেছেসুন্দর বিলরুটক্যানেল। সম্প্রতিবাগানের অদুরেএ নদীরউপরে নির্মিতহয়েছে হরিদাসপুরসেতু যামানুষের দৃষ্টিআকর্ষণ করেছে।পেয়েছে পিকনিকও পর্যটনস্পটের মর্যাদা।
শুকদেবের আশ্রম
সদর উপজেলাধীন তেঘরিয়ামৌজায় বৈরাগীরখালপাড় ছুঁয়েশুকদেবের আশ্রমটিঅবস্থিত। আশ্রমটিআনুমানিক ১৮০২সালে চন্দ্রগোঁসাইনামে একব্যক্তি প্রতিষ্ঠাকরেন। মূলউদ্দেশ্য অনাথদেরআশ্রয়সহ সেবাপ্রদান। পরবর্তীতেশুকদেব আশ্রমেরদায়িত্বভার বহন করেন এবং সংসারত্যাগী শুকদেবঠাকুর ভগবানেরকৃপায় আরাধনারমাধ্যমে অনেকবধির, বিকলাঙ্গ, বিভিন্ন ধরনেরঅসুস্থ মানুষেরআরোগ্য লাভেসক্ষম হয়।বর্তমানে উক্তআশ্রমে ডাঃমিহির ঠাকুরএর তত্বাবধানেএকটি হোমিওপ্যাথিকচিকিৎসালয় চালু আছে। নয়নাভিরাম গাছ-গাছালি আরপাখ-পাখালিরছায়াঘেরা পরিবেশঅনেক হিন্দুভক্তকে আকৃষ্টকরে। এছাড়াওদীর্ঘদিনের জটিল ব্যাধির চিকিৎসার জন্যসকল ধরণেরমানুষ ছুটেযায় শুকদেবএর আশ্রমে।
খানার পাড় দীঘি
গোপালগঞ্জ সদর উপজেলাধীনকাঠি বাজারেরকাছাকাছি ঐতিহাসিকখানারপাড় দীঘি।৩০/৩৫একর জমিতেবর্গাকারের বিশাল ও প্রাচীন এদীঘিকে ঘিরেপ্রচলিত রয়েছেলোমহর্ষক কিচ্ছা-কাহিনী, লোককথা-উপকথা। এলাকায়বসবাসকারী প্রবীণদের নিকট থেকে জানাযায় আগেকারদিনে অমাবস্যা-পূর্ণিমা ছাড়াওতিথি নক্ষত্রেরবিশেষ বিশেষদিনে সোনারনাও পবনেবৈঠা, বিভিন্নবাজনাসহ অনেকরাত্রে দীঘিপ্রদক্ষিণ করত এবং ঘাটলায় গিয়েসামাজিক আনুষ্ঠানাদিসম্পন্ন করারজন্য তৈজসপত্রেরপ্রার্থনা করা হত। এখন সেখানেপূর্বের মতপ্রার্থনা করা হয় না তবেএলাকায় প্রবীণদেরকাছে বিষয়টিআজও বিস্ময়করউপকথা।
উলপুর জমিদার বাড়ী
উলপুর জমিদার বাড়ী :
গোপালগঞ্জ সদর থেকেপ্রায় ৮কিঃমিঃউত্তরে অবস্থিতউলপুর গ্রাম।জানা যায়উলপুরের জমিদারেরাছিলেন একশতঘর শরীক।গ্রামটিতে এখনো টিকে আছে শতাব্দীপ্রাচীন বেশকয়েকটি বৃহদাকারদালান কোঠা।এর মধ্যে৭/৮টি রয়েছেদোতালা দালান। জমিদারী প্রথা কালের গর্ভে হারিয়ে গেলেওজমিদারদের পরিত্যাক্ত বিল্ডিং গুলো কালেরসাক্ষী হয়েদাঁড়িয়ে রয়েছেস্বগর্বে। পুরাতন বিল্ডিংগুলো উলপুর তহশীলঅফিস, পুরনোইউনিয়ন বোর্ডঅফিসসহ স্বাস্থ্যকেন্দ্র, সাবপোষ্ট অফিস, পুরানো সরকারীশিশু সদনহিসেবে ব্যবহৃতহচ্ছে।
৭১ এর বধ্যভূমি স্মৃতিসৌধ(স্মৃতিস্তম্ভ)
৭১ এর বধ্যভূমি স্মৃতিসৌধ(স্মৃতিস্তম্ভ)
মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে গোপালগঞ্জসদর উপজেলাসংলগ্ন ৭১এর বধ্যভূমি(জয়বাংলা পুকর) হচ্ছে এলাকাবাসীরস্মৃতি বিধুরস্থান। শতশত মুক্তিযোদ্ধাএবং মুক্তিকামীবাঙ্গালীর আত্মাহুতির নীরব সাক্ষী এবধ্যভুমি। এখানে বিভিন্ন স্থান থেকেমুক্তিযোদ্ধা এবং তাদের সমর্থকদের ধরেএনে নির্মমভাবেগুলি করেহত্যা করাহতো। পাকবাহিনীকর্তৃক জয়বাংলা পুকুর নাম করণ করেসেখানে মৃতদেহ টেনেহেঁচড়ে ফেলাহতো আরজয় উল্লাসকরা হতো।১৯৭২ সালেবাঙালী জাতিরপ্রথম বিজয়দিবস উপলক্ষেএকটি স্মৃতিস্তম্ভনির্মিত হয়যা পরবর্তীতেদুস্কৃতকারীরা ধ্বংস করে ফেলে। অতপরআলহাজ্ব সাইদুররহমান (চানমিয়া) দীর্ঘ দিনচেষ্টার পরেতৎকালীন মাননীয়জেলা প্রশাসকজনাব সাজ মআকরামুজ্জামান এবং সদর উপজেলা নির্বাহীঅফিসার জনাবমোঃ সাইফুলইসলাম ১৯৯০সালের ১৬ডিসেম্বর স্বাধীনতাদিবস উপলক্ষেএকটি স্মৃতিস্তম্ভনির্মাণ করেন।







0 Comments